জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যানমতে পৃথিবীতে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয় তা বৈশ্বিক জনসংখ্যার দেড় গুণকে খাওয়ানো সম্ভব। অথচ এত খাবার উৎপাদনের পরও প্রয়োজনীয় খাবার পাচ্ছে না বিশ্বের অনেক মানুষ। আবার কোটি কোটি মানুষ ভুগছে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায়। মূলত অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো, সংঘাত, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব, খাদ্য অপচয়ের কারণে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ার পরও মানুষকে অভুক্ত থাকতে হচ্ছে।
এর মধ্যে দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্যের ন্যূনতম ১৫ শতাংশ ক্ষতি হয়। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশও নষ্ট হয়ে যায়। যেমন মাছ, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে গতকাল ‘খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি শূন্যের পথে: বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য মূল্য শৃঙ্খল প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক এক সম্মেলনে এ গবেষণা তথ্য তুলে ধরেন বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ দিয়া সানু। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে এফএও এ গবেষণা করেছে। আর সম্মেলনটির আয়োজন করে যৌথভাবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), ডেনমার্ক দূতাবাস, এফএও, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) ও বিশ্বব্যাংক।
দিয়া সানু বলেন, ‘বাংলাদেশে ফার্ম থেকে প্রসেসিংয়ে পৌঁছার আগে প্রায় ১৭ শতাংশ ধান নষ্ট হয়। আর দুর্বল সংরক্ষণের কারণে কৃষক পর্যায়ে নষ্ট হয় প্রায় ১৪ শতাংশ। গমের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ১৮ শতাংশ। ফল ও শাকসবজির ক্ষেত্রে নষ্ট ও অপচয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে বার্ষিক হিসাব অনুযায়ী দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রবণতা এবং কোল্ড চেইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত ফল ও শাকসবজি নষ্ট হচ্ছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। একক ফল হিসেবে আমের ক্ষেত্রে এ ক্ষতি প্রায় ৩২ শতাংশ। মাছের ক্ষেত্রেও ক্ষতি ব্যাপক, ২০-৩০ শতাংশ। ছোট মাছ প্রায় ২৬ শতাংশ আর কার্পজাতীয় প্রায় ১৮ শতাংশ নষ্ট হয়ে থাকে নানা কারণে।’ পোলট্রি শিল্পে নষ্টের সঠিক হিসাব পাওয়া না গেলেও এটি ১৭ শতাংশের কাছাকাছি বলে জানিয়েছেন এফএও কর্মকর্তা দিয়া সানু।
খাদ্য নষ্ট ও অপচয়ের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনও একটি প্রধান কারণ উল্লেখ করে দিয়া সানু বলেন, ‘খাদ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেও খাদ্যের ক্ষতি ও অপচয়ে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের অন্যতম বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই আমাদের শুধু খাদ্যনিরাপত্তা ও অপুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি মোকাবেলা করতে হবে। আমরা গুরুতর জলবায়ু সমস্যার মুখোমুখি। গবেষণা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারেন গবেষকরা।’
ফসল-পরবর্তী ক্ষতি মোকাবেলায় নীতি ও কৌশল প্রণয়নের সুপারিশ করে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে অবকাঠামো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত অবকাঠামো ছাড়া আমরা ফসল-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলতে পারি না। প্রয়োজনীয় কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করতে হবে। উপযুক্ত বাজার ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিকীকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সংরক্ষণের পর সহজে বাজারজাত ও বিতরণ সম্ভব হয়। এসব ক্ষেত্রে যুক্ত করতে হবে বেসরকারি খাতকে।’
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স ২০২৪ রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৭৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে দিন কাটায়। পাঁচ বছরের নিচে প্রায় ১৫ কোটি শিশু খর্বাকৃতির বৃদ্ধি ও বিকাশ সমস্যায় ভুগছে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে। অথচ প্রতিদিন প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের খাবার অপচয় ও নষ্ট হচ্ছে। রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে শুধু গৃহস্থালি পর্যায়েই বছরে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাবার অপচয় হয়। আর প্রতিটি পরিবার গড়ে প্রতি বছর ৮২ কেজি খাবার নষ্ট করে; যা যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও জাপানের মতো উন্নত দেশের তুলনায়ও বেশি। অন্যদিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।
ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী, টেকসই নগর ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ২০৩০ সালের খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি কমাতে এখনই বাংলাদেশকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টিজনিত সমস্যা আরো বৃহৎ আকার ধারণ করবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন ও ফুড সায়েন্স ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘খাদ্য কোনোভাবেই অপচয় বা জ্ঞাতভাবে নষ্ট করা উচিত না। নষ্ট করলে সরবরাহ চেইনে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। হুমকিতে পড়তে পারে খাদ্যনিরাপত্তা। পাশাপাশি পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে।’
এফএওর পরিসংখ্যানকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, ‘অপচয় বন্ধে আমাদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি পদক্ষেপ নিতে হবে দায়িত্বশীলদেরও।’
খাদ্য অপচয় নিয়ে আয়োজিত গতকালের সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শূন্য খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় নিয়ে আলোচনা করছি। যদিও এখনো সেখানে পৌঁছতে পারিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কিনা তাও জানি না। তবে বিশ্বাস করি আমরা অর্থবহ অগ্রগতি করতে পারব। আমরা যখন নিরাপদ ও অধিক খাদ্য উৎপাদনের চেষ্টা করছি তখন বিপুল ক্ষতি ও অপচয়ের চ্যালেঞ্জেরও মুখোমুখি হচ্ছি। খাদ্যপণ্য দ্রুত নষ্ট হয়, এটিও একটি সমস্যা।’ বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মূল্যায়ন তুলে ধরে ফরিদা আখতার বলেন, ‘দেশে ১ কোটি ৫৫ হাজার থেকে ১ কোটি ৬০ হাজার মানুষ তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। খাদ্য ভোগে বৈষম্য আছে—কিছু মানুষের কাছে প্রচুর খাদ্য থাকে, আবার অন্যরা থাকে ক্ষুধার্ত। ফলে পুষ্টিগত নিরাপত্তাহীনতাও তৈরি হয়। বাংলাদেশে প্রচুর খাদ্য নষ্ট ও অপচয় ঘটে। খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত এটির পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ টন। শহরাঞ্চল, বিশেষত ঢাকায় ব্যাপকভাবে খাদ্যের অপচয় দেখা যায়।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘আমরা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য পরিকল্পনা করছি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ৩৫ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কৃষি পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ে পরিকল্পনা চলছে, যাতে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আশা করছি ডিসেম্বরের শেষে আমরা চূড়ান্ত খসড়া পরিকল্পনা তৈরিতে সক্ষম হব। এ বছর আমরা ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ দিচ্ছি এবং আরো ১০০টি আসছে। এর মাধ্যমে আমরা পরীক্ষা করছি কৃষকরা কীভাবে এর সুবিধা পায়।’
বৈশ্বিকভাবে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন টন খাদ্য নষ্ট হয়ে যায় বলে জানান বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর জেস উড। আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্যও এ চ্যালেঞ্জ সমানভাবে গুরুতর এবং কোনো ক্ষেত্রে আরো তীব্র। গবেষণা দেখায়, ফসল কাটার পর ৮-১৫ শতাংশ চাল নষ্ট হয়, কখনো কখনো এ হার ২৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত হয়। ফল, শাকসবজি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সমমূল্যের খাদ্য নানা সংকটের কারণে নষ্ট হয়ে যায়।’
সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় বিভিন্ন সেশনে আরো বক্তব্য দেন ঢাকায় ডেনমার্ক দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড্রেস কার্লসেন, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইয়াসিন, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র কৃষি স্পেশালিস্ট সামিনা ইয়াসমিন ও সন থান ভো, ইস্পাহানি এগ্রো লিমিটেডের পরিচালক ফাওজিয়া ইয়াসমিন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুল হাসান, বিএসআরআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ফেরদৌস ইসলাম, ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের মহাপরিচালক মাহবুবুর রহমান, কৃষি বিপণন বিভাগের পরিচালক আব্দুর রউফ মিয়া প্রমুখ।